প্রকাশ : ০৪ আগস্ট, ২০১৫ ১৫:১৫:৫৭
আমি এখনো বাসে চড়ি, আমার একটুও লজ্জা করে না

বাংলাদেশ বাণী টোয়েন্টিফোর ডটকম, নিজস্ব প্রতিবেদক : একটি ফল, খাদ্যপ্রাণসমৃদ্ধ মৌমাত-করা ঘ্রাণযুক্ত ফল। আরবি শব্দ ‘রেহানা’র অর্থ এরকমই। শেখ রেহানা, তাঁর একটি পরিচয়ই যথেষ্ট ছিল, তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট মেয়ে। হয়তো এই পরিচয়েই নিভৃতে নিস্তরঙ্গভাবে আনন্দে-সুখে সারাটা জীবন পার করতেন, যদি পঁচাত্তরের নির্মম-নৃশংস ঘটনা না ঘটত। সেই ১৫ আগস্ট চিরদিনের জন্যে উলটেপালটে দিয়েছিল তাঁর ও তাঁর আপা শেখ হাসিনার জীবন। সে এক মহাবৈরী সময়। পাথরসময়। যেন সেই পাষাণের ভার আর নামবে না কোনোদিন। বলা যায়, ভস্ম থেকে ফিনিক্স পাখির মতো তাঁরা ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন নতুন সংগ্রামে। তারপরের ঘটনার পরিক্রমা হার মানায় অতি কল্পঋদ্ধ উপন্যাাসকেও।

পনের আগস্টের পর তাঁদের পিছু নিয়েছিল ‘অযোগ্যের উপহাস’। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন- ‘নক্ষত্র খসিল দেখি দীপ মরে হেসে। / বলে, এত ধুমধাম, এই হল শেষে! /রাত্রি বলে, হেসে নাও, বলে নাও সুখে,

যতক্ষণ তেলটুকু নাহি যায় চুকে।’

 

অযোগ্যদের ষড়যন্ত্রকারীদের সেই তেল এখন তলানিতে। তারপরও নিত্যনতুন ষড়যন্ত্র ডানা মেলার চেষ্টা করে তাঁদের ঘিরে। এসব ষড়যন্ত্র কীভাবে মোকাবেলা করেন তাঁরা? কোথা থেকে শক্তি পান জীবন- সংগ্রামের। দুঃসময়ের দুর্বিষহ যন্ত্রণার মধ্যে কীভাবে একটু একটু করে ঘুরে দাঁড়িযেছেন তাঁরা? কী তাদের জীবনদর্শন?

 

পিতার হত্যার পর রাজনৈতিক আশ্রয়ে লন্ডনেই বসবাস শুরু করেন শেখ রেহানা। অতীব কষ্টে কালাতিপাত করেছেন, যদিও তাঁর সম্পর্কে রটনা কম নয়। সাদাসিধে ছোট একটি আড়ম্বরহীন ফ্লাটে বসবাস করেন; বাসে, টিউবে-রেলেই চলাফেরা করেন, পার্টটাইম চাকরি করেন। তিন সন্তান-রেদওয়ান সিদ্দক ববি, টিউলিপ সিদ্দিক ও আজমিনা সিদ্দিক রুপন্তী। টিউলিপ সিদ্দিক কাউন্সিলার নির্বাচিত হয়েছেন লন্ডনের ক্যামডেন কাউন্সিলের লেবার পার্টির পক্ষ থেকে। বর্তমানে তিনি পার্লামেন্টারি সিলেক্ট কমিটির সদস্য।

 

১৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৫৫ সালে জন্ম নেওয়া বঙ্গবন্ধুর এই নিভৃতচারী কনিষ্ঠা কন্যার জীবন সংগ্রামের টুকরো টুকরো ঘটনা উঠে এসেছে এই আলাপচারিতায়। জীবন-ঘনিষ্ঠ একান্ত সাক্ষাৎকারটি সম্প্রতি পাক্ষিক অনন্যায় প্রকাশিত হয়েছে।

সাক্ষাত্কার:

প্রশ্ন : তোমার মেয়ে টিউলিপ ব্রিটিশ রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়েছে- তুমি কি চেয়েছিলে যে তোমার মেয়ে পলিটিকসে আসুক? তুমি কি চেয়েছিল যে, বন্ধবন্ধুর নাতনি হিসেবে, বাংলাদেশে না হোক, যেদেশেই থাকুক না কেন- রাজনীতিতে যুক্ত হোক?

শেখ রেহানা :: আমার ছেলেমেয়ে পলিটিকসে যাক-তা আমি কখনই চাইনি। এত ভালো স্টুডেন্ট, পড়াশোনায় এত ভালো- নাটক করে, পিয়ানো বাজায়, আমি সব সময় ভাবতাম- ও উন্নতি করবেই। কিন্তু পলিটিকসে কোনোদিন জড়াবে নিজেকে এটা ভাবিনি।

 

প্রশ্ন  : স্থায়ীভাবে ব্রিটেনে বসবাস - এটা কি বাচ্চাদের নিরাপত্তার জন্য, নাকি পড়ালেখার জন্য?

শেখ রেহানা :: কিছুটা পারিবারিক, কিছুটা বাচ্চাদের লেখাপড়ার জন্য। ওরা ওই দেশের (ব্রিটেনের) নাগরিক। ওখানে পড়াশোনার এত সুযোগ-সুবিধা! মানুষ জমি-বাড়িঘর বিক্রি করে ছেলেমেয়েকে বিদেশে পড়াশোনা করতে পাঠায়। আমি ভাবলাম, এই সুযোগ থেকে ওদের বঞ্চিত করব কেন? আমি নিজে থেকেও টাকা-পয়সার কারণে পড়াশোনার সুযোগ পাইনি- ওটাও একটা কারণ। আর, নিরাপত্তা তো ছিলই। কারণ এখানে (বাংলাদেশে) নানারকমের হুমকি-টুমকি পেতাম। সেজন্য ভাবলাম ওদের ওখানেই পড়াই।

 

প্রশ্ন : আজকাল যাদের সামর্থ আছে তারা বাচ্চাদের ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ায়। তাদের বাচ্চারা বাংলাটা ভিন্নরকম অ্যাকসেন্টে বলে। তোমার বাচ্চাদের সাথে কথা বললে মনে হয়, এই সমস্যাটা তাদের নেই।

শেখ রেহানা:: ওদের সাথে আমার প্রথম কথাই ছিল- তোমরা বাড়িতে বাংলা বলবে। বাংলা পড়তে হবে। কারণ তোমরা বঙ্গবন্ধুর নাতি। আমার সঙ্গে গ্রামগঞ্জে যেতে হবে। সেখানে আত্মীয়-স্বজন সবাই ইংরেজি পারে না - একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে যাবে। তো, তারা অন্য বন্ধুদের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলত, কিন্তু বাড়িতে বলত বাংলা। কোনো একসেন্ট দিয়ে ওরা বাংলা বলে না। স্পষ্ট বাংলা বলে। বাসায় ওদের আমি প্রচুর বাংলা বই পড়াতাম। প্রথম ভাষাটাই ওরা বাংলা শিখে।

প্রশ্ন : যখন তুমি ওদের বাংলা বই পড়াতে সেখানে নিশ্চয়ই রবীন্দ্রনাথ, নজরুল আর আমাদের মুক্তি সংগ্রামের বইও থাকত?

শেখ রেহানা:: হ্যা, নজরুল-রবীন্দ্রনাথ আর নেতাজী সুভাষের বই বেশি পড়াতাম। কবিতা পড়াতাম। জীবনানন্দ দাশ ও সুকান্তের কবিতা পড়াতাম। বেগম রোকেয়ার বই আমি পড়ে পড়ে শোনাতাম। টিউলিপের মাস্টার্সের যে ডিসার্টেশন- সেটা রবীন্দ্রনাথের উপরে লেখা। যদিও সেটা ইংরেজিতে। রবীন্দ্রনাথের ‘নষ্টনীড়’ পড়ে আমার মেয়ে পাগল হয়ে গিয়েছিল। আমি বাংলায় পড়তাম। ও সেটা ইংরেজি করত। এবং টিউলিপের যখন বিয়ে হয়- রেজিস্ট্রেশনের সময় প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে আমি ‘আলো আমার আলো’ কবিতাটি পড়াই।

 

প্রশ্ন  : আমরা যতদূর জানি, বঙ্গবন্ধু কবিতা আবৃত্তি করতেন। সাহিত্য, সংস্কৃতির প্রতি বঙ্গবন্ধুর গভীর আগ্রহ ছিল। সাহিত্যের প্রতি এই ভালবাসা তুমি কি বাবার কাছ থেকে পেয়েছ? নাকি মায়ের কাছ থেকে? কিংবা দুজনেরই প্রভাব রয়েছে?

শেখ রেহানা :: মা প্রচুর বই পড়তেন। আর আব্বার কাছ থেকে তো অবশ্যই। আমি তো এ্যাডভান্স বাংলার ছাত্রী ছিলাম কলেজে। আপনি জানেন না বোধহয়, ছোটবেলায় ইত্তেফাকের কচিকাঁচার আসরেরও সদস্য ছিলাম। মাঝে মধ্যে একটা- দুইটা লেখাও ছাপা হত।

 

প্রশ্ন  : বেবী মওদুদ যখন বেঁচে ছিলেন তোমার একটা-দুইটা লেখা আমরা দেখতে পেতাম। তোমার নিশ্চয়ই লিখতে ইচ্ছে করে, এত কম লেখা দেখতে পাই কেন?

শেখ রেহানা :: হ্যাঁ, আমি লিখি কিন্তু ছাপানোর ইচ্ছেটা কম।

 

প্রশ্ন  : তোমার আত্মজীবনী লিখতে ইচ্ছে করে না?

শেখ রেহানা :: বঙ্গবন্ধুর কন্যা ছাড়া আমার তো জীবনীর আর কি আছে? 

 

প্রশ্ন  : কিন্তু তোমার দেখা পরিবারের যে ঘটনাগুলো- সেটাতো আমাদের ইতিহাস। এর একটা বিরাট মূল্য আছে। সেই দিক থেকে তোমার আত্মজীবনীও অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

শেখ রেহানা :: অনেক ঘটনা আমি অল্প অল্প করে লিখে রাখি। আর বেবী (মওদুদ) আপা জোর করে বসে থেকে লিখিয়ে নিত। বলত, আমি উঠব না। আর, অনেক সময় ঘটনা যখন দেখি মানুষ পেপারে মিথ্যা কথা লেখে, তখন আপাকে (শেখ হাসিনা) বলি- ‘আপা, এটাতো ডাহা মিথ্যা কথা।’ উনি বলেন, ‘তুমি লিখো না কেন?’ আমি তখন লিখে রাখি- ঘটনা এটা না, ওটা। আমি তখন ছোট হলেও অনেক ঘটনার সাক্ষী। আর বঙ্গবন্ধুর কোনো গুণ না পেলেও স্মরণশক্তিটা এই বয়সে এসেও আল্লাহর রহমতে খুব ভাল আছে। একবার যেটা দেখি বা শুনি সেটা আর ভুলি না। কিন্তু অনেক জিনিস চোখের দেখা- এখন মনে পড়ে- ঐ যে সাতই মার্চের ভাষণ- আমি, আপা, দুলাভাই, আমরা তো সামনে দাঁড়ানো ছিলাম। আব্বাতো কখনো ‘জয় পাকিস্তান’ বলে নাই। আব্বা নেমে যাওয়ার পরে আমরা বের হয়ে শহীদ মিনারের কাছে চলে আসলাম। স্পষ্ট মনে আছে। মানুষ যখন এই কথাগুলো বলে, সবাই না, কিছু লোক, তখন মনে হয় এই লোক এমন মিথ্যা কেন বলে? আব্বা বেঁচে নেই। যেই লোকটা বেঁচে নেই তার সম্পর্কে কেন মিথ্যা কথা বলছে? আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময়- ছোট হলেও দেখতাম, কিভাবে কি ঘটনা ঘটছে, জানতাম। অনেক সময় মা আলোচনা করতেন। তারপর ৬ দফার সময় খুব ছোট ছিলাম। বাড়িতে তো একটা রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল। তারপর তাজউদ্দিন চাচাকে নিয়ে কত ধরনের কথা, সত্য- মিথ্যা মিশিয়ে। আব্বা ও তাজউদ্দিন চাচার মধ্যে যে একটা সম্পর্ক ছিল যেই যাই লিখুক, তাদের সম্পর্ক আপন ভাইয়ের চেয়েও বেশি ছিল। আব্বা জেলে কেন- এই প্রশ্নটা মনে আসত। দেশের জন্য, মানুষের জন্য কাজ করে, মানুষকে ভালবেসে- মায়ের মুখে দাদির মুখে শুনতাম। শুনতাম, কিন্তু মুখ বন্ধ রাখতে হবে। কারণ বাড়ির সামনে সবসময় আইবি’র লোক।

 

প্রশ্ন  : রাজনৈতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠাও তো রাজনৈতিক ট্রেনিংয়ের মতো।

শেখ রেহানা :: হ্যাঁ, আমিও আমার বাচ্চাদের রাজা-রানির গল্পের পাশাপাশি রাজনীতির কথা, বাংলাদেশের ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন, মায়ের মুখে যা শুনেছি- সেগুলো বলতাম। ওরা তখন অনেক ছোট, ওরা তো বুঝবে না যে কীভাবে ঘটেছে পঁচাত্তরের নৃশংস ঘটনা, ওরা তো গুলি বুঝত না। এটাকে অন্যভাবে বলতাম। বড় হয়ে তো ওরা নিজেরাই বুঝতে পেরেছে। আমরাও মায়ের কাছে থেকে এভাবেই শিখেছি। মা-দাদির কাছ থেকেই বেশি শেখা। নানা ধরনের লোকজন আসত। এসবির লোকজন বাড়ির সামনে-পিছনে নানা জায়গায় থাকত। মা বলত. কেউ কিছু দিলে হাতে নিবে না, বাড়ির কোনো কথা কাউকে বলবে না। আমরা দুই ভাইবোন স্ট্যাম্প কালেক্ট করতাম। যখন মিরপুর রোডে আবাহনী বা সোবহানবাগে খেলতে যেতাম, কেউ প্রশ্ন করলে আমরা চুপ করে থাকতাম, বলতাম না। জিজ্ঞেস করত, বাড়িতে কে কে? কে আসে না আসে। যার জন্য একেক জনের বিশেষ কোড নাম ছিল। এ ইটওয়ালা, ও সিমেন্টওয়ালা, ও বালিওয়ালা।

 

প্রশ্ন  : আমি সব সময় দেখেছি যে, তোমার কথার মধ্যে দারুণ সেন্স অব হিউমার প্রকাশ পায়। তুমি কোনো ঘটনা এমনভাবে বর্ণনা করো, ওটা যদি কষ্টেরও হয়, তার মধ্যেও একটা হিউমার থাকে।

শেখ রেহানা :: হ্যাঁ, এভাবে নিজেকে আমি হাল্কা রাখি।

প্রশ্ন : তোমাদের তখন এত কষ্ট এত সংগ্রামের মধ্যেও কিন্তু মা তোমাদের ভাইবোনদের মানুষ করেছেন। এখনকার দিনে দেখা যায়, পাঁচটা বাচ্চা থাকলে অনেক সময় তিনটাই বখে যায়। আবার বাবা-মা যখন বিখ্যাত হন তখন অনেক সময় বাচ্চাদের মাথা ঘুরে যায়। কিন্তু তোমরা একদম মাটির সাথে মিশে বড় হয়েছ। এই যে তোমার বাচ্চারা বিদেশে লেখাপড়া করে, তাদের নিয়েও মাটির সাথে গ্রামের সাথে একটা সংযোগ তৈরি করেছে। এই বৈশিষ্ট্য কি তুমি মা-বাবার কাছ থেকে পেয়েছ? না কি ভিতর থেকেই- বাংলার মাটি, বাংলার প্রতি ভালোবাসা থেকে পেয়েছ?

শেখ রেহানা :: ভিতর থেকে তো অবশ্যই। দাদির কাছ থেকে অনেক কিছু শেখা। আর আমার মায়ের কাছ থেকে। আমার মায়ের জীবনে এত কষ্ট, এত সংগ্রাম! ভালো স্কুলে পড়ানোর জন্য মাকে কত কথা শুনতে হয়েছে। কিন্ডার গার্টেন, শাহীন স্কুল, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পড়ানো, নাচ শেখানো, বুলবুল একাডেমিতে ভর্তি করানো- সবই মায়ের উৎসাহে। অনেকে বলতেন- হ্যাঁ মেয়েকে নাচাবো নাকি। মা বলতেন- না, শিখুক সবকিছু, কখন কী দরকার হয়। মা সব সময় একটা কথা বলতেন, ঐ কার্পেট, ঐ ঝাড়বাতি- এগুলো কিন্তু কিছুই না। তোমার নিজস্ব যেটুকু, সেটুকুই তোমার। আমার বাচ্চাদেরকেও ঠিক সেভাবেই গড়েছি। যেদিন আপা (শেখ হাসিনা) পাওয়ারে আসলেন, আমরা গণভবনে গেলাম। আমার বাচ্চাগুলো তখন ছোট ছোট। ববি ছোট, টিউলিপ ছোট, রুপন্তী তো একেবারেই ছোট। আমি বললাম যে, এইগুলা কিন্তু নাট্যমঞ্চ, আসল না। আমার ছেলেকে বললাম, অনেক বয়স্ক লোক তোমাকে স্যার বলে সালাম দেবেন, তুমি কিন্তু নীচের দিকে তাকিয়ে সম্মান করবা। তুমি ববি, তুমি কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নাতি- এই কথাটা তোমাকে মনে রাখতে হবে। এই দামি গাড়ি, এই চাকচিক্য- এগুলো কিছুই না। ওরা এখন পর্যন্ত সেই রকমই আছে। এটুকুই আমাদের জীবনের সার্থকতা। আর টাকা-পয়সা হিসেব করে চলার বিষয়টিও ছিল। দোকানে গেলে বেশি না, একটা মাত্র ভালো জিনিস কেনো- হয় চকলেট, আইসক্রিম বা অন্য কিছু। কিন্তু একটার বেশি নয়। এখন পর্যন্ত এটা ওরা ধরে রেখেছে। এখন তো ওরা নিজেরাই উপার্জন করে। কিন্তু এখনও বলি, একদিনে বেশি খুশি হয়ো না, কালকের জন্য রাখো। আজকে আইসক্রিম খাবে তো কেক হবে না।

 

প্রশ্ন  : দারুণ ব্যাপার। এই সংযমটা আজকাল বাচ্চারা পারে না। শুধু বলে- দাও দাও। আর মায়েরা খুশি করার জন্য দিয়েও দেয়, সংযম শেখানোর কষ্টটা মায়েরা নিতে চায় না।

শেখ রেহানা :: নতুন কিছু হাতে দেখলে প্রশ্ন করতাম, এটা কোথায় পেলে? ওরাও আমার কাছে নতুন কিছু দেখলে প্রশ্ন করে, মা এটা কোথায় পেলে? আমার মাও তাই করতেন। আমাদের সময় গল্পের বই আর গানের রেকর্ড- উপহারের মধ্যে তো এই দুটোই ছিল। এখন তো কত ধরনের উপহার!

 

প্রশ্ন : বঙ্গবন্ধুকে যখন নির্মমভাবে হত্যা করা হলো, সেই নৃশংসতার মধ্যেও কিছু মানুষ কুৎসা রটাল- ওই বাড়িতে অনেক সোনা-দানা, সোনার মুকুট। কিন্তু যখন বাড়ি সার্চ করা হলো-তখন এসব কুৎসা মিথ্যা প্রমাণিত হলে। কোথাও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের কাগজপত্র- কিছুই দেখাতে পারল না। বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়িটি ছাড়া আর কোথাও কেউ কিছু দেখাতে পারেনি ষড়যন্ত্রকারীরা। সেটা নিয়ে কেউ কিছু বলেও না। তোমরা বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে তখন দেশেও আসতে পারতে না। এই যে বলে, বাক্স ভর্তি টাকা এসেছে। লন্ডনে রেহানার বিপুল অর্থসম্পদ! এই যে একেবারে বানোয়াট কথা, এসব শুনলে তোমার কেমন লাগে? কতটা রাগ লাগে? আর তোমার বাচ্চাদের যে এত সুন্দর করে মানুষ করলে, সেটা দেখলেও আমাদের দেশের অনেকে ভাবে- এইসব অর্জন বুঝি বাংলাদেশে যেমন একে-ওকে ফোন করে পাওয়া যায়, তেমনি করে পাওয়া। বাংলাদেশে যেভাবে নমিনেশনও পেয়ে যায়, ভোটও পেয়ে যায়- ব্রিটেনে তো সেটা সম্ভব নয়। তাই, এসব মিথ্যা কথা তুমি কি করে সহ্য করো?

শেখ রেহানা:: আগে খুব কষ্ট হতো, অভিমান হতো। আমরা এত কষ্ট করলাম- আব্বা প্রধানমন্ত্রী থাকার পরও বকশিবাজারে রিকশা করে যেতাম।

 

প্রশ্ন  : তোমরা যখন লণ্ডনে গেলে, ঐ সময়? চেনা মানুষরাও তোমাদের পাশ দিয়ে যেত, তাকাত না। কিন্তু তুমি চাকরি করেছে, পাবলিক বাসে যাতায়াত করেছ-

শেখ রেহানা :: হ্যাঁ আমি এখনো বাসে চড়ি, আমার একটুও লজ্জা করে না। আমার চাচা, আব্বার কাজিন, উনি বলতেন, মা আমি তোকে ট্যাক্সি করে দেই। আমি বলেছি, না আমি চলে যাব। ঐ তো স্টপেজ। বলেছি, চাচা, আব্বা যদি টাকা চুরি করে রেখে যেত এত জোরে কথা বলতে পারতাম? আমার বুকটা এত বড় হয়ে যায়। মাঝেমাঝে মনে হতো- বাচ্চাদের জন্য এটা-ওটা করতে পারছি না! আব্বা বলতেন ‘দেখো, অন্য লোকদের দেখো- তারা কত কষ্টে আছে। তোমরা তো তাও দুই বেলা ভাত পাচ্ছ।’ ঐ সব কথা চিন্তা করি, মায়ের কথা, দাদির কথা চিন্তা করি। আমার তো বাচ্চার দুধের টিনের জন্য লাইন দিতে হচ্ছে না। আমি ওদের মুখে তাও তো কিছু দিতে পারছি। দাম কম হলেও একটা খেলনা তো কিনে দিতে পারছি, অন্যরা তো তাও পারেও না। আমরা তো মাটির পুতুল বা বিদেশ থেকে একটা উপহার আনলে ওটা শোকেসে রেখে দিতাম।

 

প্রশ্ন  : এই যে তুমি কথাগুলো বললে, এই উপলব্ধিই তো মানুষের হয় না। ভুলে যায় মানুষ। অতীতের সব কিছু ভুলে বর্তমানের সুখটাকেই সারা জীবনের জন্য ধরে রাখতে চায়। তুমি এত কষ্টের পরও হাসি মুখে কথাগুলো বলছ! এটা আমাদের দেশের মেয়েদের জন্য অনেক বড় আত্মশিক্ষা! তুমি কেমন করে পারো? কোথা থেকে পাও আত্মশক্তি?

শেখ রেহানা:: আমার মা, আমার দাদির কাছ থেকে পাই। আর আমার আব্বা। আমি কার মেয়ে- সবসময় এটা মনে রাখি। আব্বার ডায়েরি পড়ার পর থেকে তো আমি আরো অবাক হয়ে গেছি। এই যে জেলখানায় এত কষ্ট, তারপরও হাসিমুখে দেখেছি আব্বাকে, আর সবসময় মানুষের কথা চিন্তা করতেন। পাকিস্তানের তরফে তাকে তো কতরকম অফার দেয়া হয়েছিল- আমাদের পাকিস্তানে নিয়ে আরাম আয়েশে রাখার...। আব্বা কম্প্রোমাইজ করতে পারতেন। করেননি তো। আমার দাদার তো গোলাভরা ধান ছিল। পেট ভরে খেতে পারতাম। আমাদের প্রাচুর্য ছিল না, কিন্তু যা ছিল তা ভালো মত বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট। আর আমি মনে করি, দান করলে কখনো কমে না। আমার ছেলে মেয়ে এখনো একটা জিনিস যদি কাউকে দিয়ে দেয়, যদি আমি জিজ্ঞেস করি- ‘কেনো দিয়ে দিলে?’ বলে, মা তুমি তো বলেছো, ‘দিলে কমে না। নানা, তোমার দাদি কাউকে ফিরায় নাই। একমুঠো চাল হলেও লুকিয়ে দিয়ে দিতেন।’ এখন যখন খুশির কিছু হয় তখন ইচ্ছে করে, দৌঁড় দিয়ে মায়ের কাছে গিয়ে সব বলি। আপা (শেখ হাসিনা) যে এত কাজ করতে পারেন, মায়ের তো ধারণা ছিল আপা খুব আরাম প্রিয়।

 

প্রশ্ন  : বড় সন্তান বলে?

শেখ রেহানা: হ্যাঁ ইউনিভার্সিটিতে যাবে, কাপড়টাও মা রেডি করে দিতেন। আপা এসে তো গল্পের বই আর অনুরোধের আসর নিয়ে বসতেন।

 

প্রশ্ন  : তোমার মুখে শুনেছি- বই পড়া, সিনেমা দেখা, আপার খুব সখ ছিল।

শেখ রেহানা: হ্যাঁ, মাঝে মাঝে পুরানো গান, পুরানো সিনেমা ছেড়ে দেই। লন্ডনে যখন ফোন করে গান ছেড়ে দিয়ে বলি এই গানটা মনে পড়ে? আপা অবাক হয়ে বলে- ‘এটা কোথায় পেলি?’ আমার তো গানের অনেক কালেকশন। টিউলিপ যখন ওখানে (ব্রিটেনে) অনেক ভোটের ব্যবধানে জিতে এমপি হয়- আমার একটাই আফসোসের কথা আপাকে বলি, ‘আপা আমি যদি দৌঁড় দিয়ে মায়ের কাছে গিয়ে বলতে পারতাম!’ যখন খুব অস্থির হয়ে যাই, তখনি হঠাৎ করে আমার মায়ের কথা মনে হয়। মাইক্রোওয়েভে আমরা খাবার গরম করি, পাঁচ মিনিট সহ্য হয় না। আমি তখন চিন্তা করি, আমরা পাঁচটা ভাইবোন। ন্যাপি তো দূরের কথা, কাঁথা ধুতে ধুতেই তো মায়ের জান শেষ হয়ে যেত। মা কেমন করে পারত? তাহলে আমি পারব না কেন? তারপরে রান্নায় গ্যাস জ্বালিয়ে দেই, বাজারে সব রেডি, আর মা লাকড়ি চুলায় ফুঁ দিয়ে দিয়ে-গাল দুটো লাল টকটকে হয়ে যেত। পরিবারের লোকজন, পলিটিক্যাল লোকজন, পুরা গুষ্ঠির রান্না। মা কেমন করে পারতেন? বর্ষাকাল আসলে মায়ের সে কি চিন্তা! তখন তো গ্যাস ছিল না। আমাদের লাকড়ির চুলা আর একটা কয়লার চুলা ছিল। আমারও অবশ্য ডিসপোজেবল ন্যাপি বাচ্চাদেরকে পরানো সৌভাগ্য হয়নি। আমি বাথটাবের মধ্যেও বসে বসে কাপড় কাচতাম। আপা একবার দেখে আমাকে একটা ওয়াশিং মেশিন কিনে দিয়ে আসে। কারণ আমার তখন অপারেশন হয়েছিল- খুব কষ্ট হতো।

 

প্রশ্ন : মা-দাদির জীবন সংগ্রামের সাথে নিজেকে তুলনা করে দেখা?

শেখ রেহানা :: হ্যাঁ, এই সব জিনিস চিন্তা করি, আর ভাবি- আমি কত ভালো আছি! আর, আমার থেকে কত কষ্টে আছে কত মানুষ। এই যে ইয়াং মেয়েরা, যাদের স্বচ্ছলতা নেই, যারা বস্তিতে থাকে। জীবনে আনন্দ কী জিনিস জানে না। কর্মজীবী মেয়েদের কত সমস্যা, কত বাধা থাকে। তখন চিন্তা করি, আমরা কত লাকি। একটা সাজের জিনিস, একটা লিপিস্টিক পেলে আমার মেয়ে কত খুশি হয়! ঠিক রুপন্তীর বয়সের আরেকটি মেয়ে, তারাও পেলে খুশি হয় নিশ্চয়ই, কিন্তু পায় না। আমার বাসায় আমাকে যারা হেলপ করে, আমি যখন কারো জন্য কিছু কিনি ওদের জন্যও কিছু নিয়ে আসি। সেটা হতে পারে একটা লিপিস্টিক, ক্রিম, লোশন, সাজার জিনিস, ভালো সাবান। সবার জন্যে তো আনা সম্ভব হয় না। যতটুকু পারি, মানুষের একটা সময় থাকে, যখন পছন্দের জিনিস দেখলে বেহুশ হয়ে যেতে হয়- এটা লাগবেই, কিনতেই হবে! কিন্তু এখন যত বয়স বাড়ছে, ততই মনে হয়, এটা লাগবেই কেনো? না কিনলেই কি হয় না?

 

প্রশ্ন  : তোমাকে কখনো দেখিনি, দামি শাড়ি পড়তে। হীরার দামি কিছু পড়তে।

শেখ রেহানা : আসলে, আমার এসবে লজ্জা লাগে। মনে হয়, কি দরকার। আর, আমার হীরা-জহরত, সোনাদানা না, জিনিসটা সুন্দর হলেই আমি খুশি, সেটা ইমিটেশন বা রুপার হোক, আর শাড়ি সুতী বা বেনারসি যাইহোক না কেন- একটু আরাম ও সুন্দর হতে হবে, তাহলেই আমি খুশি। আমি সুন্দরের পূজারি। (হেসে) দেখেন না আপনারে আমি কত পছন্দ করি।

 

প্রশ্ন  : তোমার মেয়েদের দেখলেও মনে হয় সুন্দরের পূজারি। আমারতো মনে হয় টিউলিপ খুব রোমান্টিক।

শেখ রেহানা :: হ্যাঁ।

 

প্রশ্ন  : ও এতো সুন্দর একটা মানুষকে বিয়ে করল। মনে হয় ওর স্বামী ওর ব্যাপারে খুব টেক কেয়ারিং।

শেখ রেহানা :: ও টিউলিপকে এত সহযোগিতা করে। চাকরি থেকে পাঁচটা মাস ছুটি নিয়ে দিন নাই রাত নাই চব্বিশ ঘন্টা টিউলিপকে সাহায্য করেছে।

 

প্রশ্ন  : আচ্ছা, টিউলিপ প্রথম যখন বলল, আমি ব্রিটিশ পলিটিকসে যেতে চাই-তখন তোমার ভিতরে কেমন প্রতিক্রিয়া হয়েছিল?

শেখ রেহানা:: আমি বললাম, মা! আবার সেই পলিটিকস! আমি সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে বিদেশে এসেছি, যাতে পলিটিকসের ছায়া আমার ওপর না থাকে। রাজনীতির সাথে যে একেবারেই ছিলাম না, তা নয়। ধানমন্ডি স্কুলে ছাত্রলীগের কমিটি করতে কামাল ভাই পাঠালেন আমি ওখানে সেক্রেটারি ছিলাম। কাগজটা আজও আমার কাছে আছে। কলেজে অতটা জড়িত ছিলাম না কারণ আব্বা তখন ক্ষমতায়। রাজনীতি থেকে একটু দূরে সরে থাকতাম। পঁচাত্তরের পরে- এটা পলিটিকস না, আমার নিজের চ্যালেঞ্জ ছিল যে- ওরা কি মনে করে? আমার তিন তিনটা ভাইকে ওরা শেষ করে দিল, আমাদের দুই বোনকে হিসেবের মধ্যেই ধরে না! সুইডেনে প্রথম প্রতিবাদটা আমিই করি। আপাকে চিঠি লিখলাম, আপা, একটা সুযোগ চলে আসছে মিনিস্ট্রিতে গিয়ে প্রতিবাদ করা। এই প্রথম প্রতিবাদটা আমিই করি।

 

প্রশ্ন : এটা কত সালে?

শেখ রেহানা :: ১৯৭৮ বা ৭৯ সালে। তারপর লন্ডনে মালেক উকিল সাহেব ও কামাল হোসেন সাহেবকে নিয়ে প্রেস কনফারেন্স করি। এরপর স্যার উইলিয়ামের কথা মনে ছিল- উনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় কাজ করেছিলেন; আমি শফিক চাচা, খোকা চাচা তাকে খুঁজে বের করে হাউজ অব কমন্সে গিয়ে স্যার হ্যার উইলসনের সঙ্গে দেখা করি। উনি আমাদের বুদ্ধি দিলেন- তোমরা এনকোয়ারি কমিটি কর, আমি সহযোগিতা করব। তখন হাউস অব কমন্সে প্রবেশে পাশ পেতেই আমার এক বছর লেগে যায়। এখন তো আমার মেয়ের কারণে যখন তখন ঢুকে পড়ি। ওই হাউস অব কমন্সে তিনি বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল স্পিচ দিতেন। শন ম্যাগগ্রা, মাইকেল ওয়ান্স, স্যার টমাস উইলিয়াম ছিলেন। মতিন সাহেবের (আব্দুল মতিন) বই ‘ট্রিবিউট টু বঙ্গবন্ধু’-এ ওনাদের সব বক্তব্য আছে। এভাবে আস্তে আস্তে করে আগালাম। এটা তো পলিটিকস। আপা যখন ঢাকা আসলেন, তখন বাচ্চাদের দায়িত্ব আমি নিলাম। প্রথম প্রথম কেউ এসে যদি আমাকে পলিটিকসের কথা বলত- খুব রাগ করতাম। বাড়ি থেকে বের করে দিতাম। বলতাম- আবারো পলিটিকস, সব শেষ করে তোমাদের হলো না? তারপর এক সময় আপাকে বললাম, ‘না, আপা পলিটিকসে যেতে হবে। তুমি যেহেতু বড়, তুমি পলিটিকস কর, আমি তোমার বাচ্চাদের দেখি।’ প্রত্যক্ষ- পরোক্ষভাবে পলিটিকসের সঙ্গে ছিলাম। কিন্তু আমার ছেলে মেয়ে পলিটিকস করবে- তা ভাবিনি। সব সময় বলতাম- পলিটিকস থেকে শত হাত দূরে থাকবে। পলিটিকস ছাড়াও তো মানুষের সেবা করা যায়। মাদার তেরেসাকে দেখ। এদের উদাহরণ দিতাম। এখন মেয়ে পলিটিকসে, এটা হয়ত জেনেটিকস ও ভাগ্য।

 

প্রশ্ন  : তোমার যে ছোট মেয়েটা, রুপন্তী, ওকে দেখলে আমার মনে হয়- ওর মধ্যে একটা অদ্ভুত শক্তি আছে।

শেখ রেহানা :: হ্যাঁ, ও শক্ত মেয়ে। অল্প বয়স থেকেই ও বুঝেশুনে চলে। ওর জীবনটা অত সহজ ছিল না। ওর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ায় এক বছর বয়স থেকে আমার কোলে কোলে সাতটা বছর ওকে হাসপাতালেই কাটাতে হলো। ওদের বাবার অসুখের সময় টিউলিপের নয় বছর আর ববির এগার বছর। ওরা তো রাতারাতি আমার গার্ডিয়ান হয়ে গেল। এই দুটো বাচ্চাই তো রুপন্তীকে বড় করল। আমি তো ওদের সাথে আলাপ করতাম- কি করব এখন? ওরাই আমাকে বুদ্ধি দিত, মা এটা কর, ওটা করলে ভাল হবে। ওদের সঙ্গে আলাপ করেই সিদ্ধান্ত নিতাম।

 

প্রশ্ন  : তোমার স্বামীর অসুখের পরে তোমার পরিবারটা বিপদ থেকে আরো শক্তি অর্জন করল, শক্ত হল। ওই বিপদটাকে তোমরা সবাই মিলে মোকাবিলা করলে, তাই না?

শেখ রেহানা :: ওই বয়সে একটা মনের মত জায়গায় সকল সুযোগ সুবিধা হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যাওয়া, চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে ফিরে আসা, এত খরচের ধাক্কা

 

প্রশ্ন  : তখন বাচ্চাদের পড়াশুনায়ও তো একটা ধাক্কা লাগল।

শেখ রেহানা :: হ্যাঁ, পড়াশুনায় কিছুটা ধাক্কা তো লাগলই। তার মধ্যেও তখন আমি হাসপাতালে এক চাইনিজ মহিলার কাছে ছেলেমেয়ের অঙ্ক আর ইংরেজিটা পড়ানোর ব্যবস্থা করেছিলাম। ওই মহিলার সাথে আমার বেশ বন্ধুত্বপূণ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। তিনি ওদের পড়াতে কোনো পয়সা নিতেন না। ছেলে মেয়েদেরকেও সান্তনা দিতাম। বলতাম, ধৈর্য ধর, স্কুল কলেজে পড়াশুনা- সবই হবে। আস্তে আস্তে হবে। আব্বার উদাহরণ দিতাম। আব্বার চোখে অপারেশনের কারণে চার-পাঁচ বছর পড়তে পারেন নাই। আব্বা জেলে থাকার সময় আমারো স্কুল বন্ধ ছিল। আমি শাহিন স্কুলে ছিলাম। কামাল ভাই পাশ করে ঢাকা কলেজে চলে আসল। জামাল ভাই রেসিডেন্সিয়াল মডেলে গেল। মা বেতন বাড়াতে পারেনি বলে আমাদের গাড়ির ড্রাইভার চলে গেল। মা একা আমাকে এতদূর যেতে দিতেন না বলে এক বছর স্কুলে যেতে পারিনি। আমি নিজে একা একা আজিমপুর স্কুলে গিয়ে ক্লাস ফোরে ভর্তি হয়ে আসছিলাম। স্টেট বাসে করে যেতাম। ছয়মাস পর ধানমন্ডি স্কুলে ক্লাস ফাইভে ভর্তি হলাম।

 

প্রশ্ন  : তোমার বাবা তোমার মায়ের রান্না ছাড়া খেতেন না। খাওয়ার সময় একটা স্ত্রী তার স্বামীর পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন, তার পর বাচ্চাদের খাওয়ানো- এই যে একটা দেশের জাতির পিতার বাড়িটা একটা সাধারণ বাড়ি। ছোট্ট একটা ডাইনিং টেবিলে পাঁচ- সাতজন খাচ্ছে

শেখ রেহানা :: এই সুখ এই শান্তি রাজপ্রাসাদের পাওয়া যেত না। মা-বাবা, ভাইবোন সবাই একসাথে বসে খাওয়া। আমাদের নিয়ম ছিল, দাদা দাদি যখন একসাথে খেতে বসতেন, আমাদের পালা করে তাদের কাছে থাকতে হত। হাতে হাত পাখা নিয়ে। আমি থাকলে আমি, আপা থাকলে আপা। দাদা দাদি খেতেন।

 

প্রশ্ন : এখন তোমার নিজেরই নাতি আছে। নাতিদের জান দিয়ে ভালবাসতে ইচ্ছে করে, তাই না?

শেখ রেহানা :: উহ, এত সুখ বোধহয় পৃথিবীতে আর কিছুতে নাই। আমি কখনো কল্পনাই করি নাই যে, বেঁচে থাকব- নাতি নাতনি নিয়ে আমার মায়ের বড় সখ ছিল।

 

প্রশ্ন  : বাবার সংগ্রামের সাথে সাথে পারিবারিক সংগ্রাম তারপর তোমার সংগ্রাম। তোমাদের জীবনটাই সংগ্রামে ভরা। এই সংগ্রাম মোকাবিলার শক্তি আল্লাহতালা বাচ্চাদের ভিতর দিয়ে তোমাকে দিলেন।

শেখ রেহানা :: আমাদের নবী করীম (সা:) এর কথা চিন্তা করি। তার জীবনটাও সহজ ছিল না। ওখান থেকেও আমি শক্তি পাই। আমি বাসায় কাজ করি, রান্না, কাপড় ধোওয়া, বাজার করা, মাঝে মাঝে টায়ার্ড হয়ে যাই। তখন ভাবি নবীজী তো তার মেয়েকে বলতেন, আলহামদুলিল্লাহ পড়ো। আর, আমার মায়ের কথা চিন্তা করি। আমাদের কাজ করতে দেখলে আব্বা খুশি হতেন। এভাবে নিজের ভিতরে শক্তি আনি।

 

প্রশ্ন : তোমার কি মনে হয়- এই সংগ্রাম সহজে শেষ হওয়ার নয়? আপার সংগ্রাম তো শেষ হয়নি। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও এখনো যে কনস্ট্যান্ট ষড়যন্ত্র হয়, সেটাকে প্রতিনিয়ত ওনাকে মোকাবিলা করতে হয়। এই সংগ্রামে তোমার কি ভয় লাগে যে, আবার একটা ভয়ঙ্কর অবস্থার মুখোমুখি হতে হয় যদি? তোমার বাচ্চারা তো দেশে আসে, দেশকে ভালবাসে। দেশের জন্য কিছু করতে চায়।

শেখ রেহানা :: ভয়তো থাকেই। আল্লাহকে ডাকি। আর ঐ বিশ্বাস, আল্লাহর হুকুম যেটা হবে, হবেই। সেটা ঘরের ভিতরে থাকলেও হবে, বাইরে থাকলেও হবে। আল্লাহর হুকুম ছাড়া তো গাছের পাতাও নড়ে না। আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছি। তার কাছে স্যারেন্ডার যে- আল্লাহ তুমি রক্ষা করো।

 

সূত্র: পাক্ষিক অনন্যা

(সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন পাক্ষিক অনন্যার সম্পাদক ও প্রকাশক এবং দৈনিক ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন।)


 


বিবি/এইচ-ডি//ডেস্ক০৪/০৮/২০১৫. ১৬.৪৫ (পিএম) ঘ.



 

সর্বশেষ সংবাদ
  • বিএনপির সঙ্গে কোন রাজনৈতিক সমঝোতা নাকচ করে দিলেন প্রধানমন্ত্রীট্রাম্প হচ্ছেন ‘আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নবাগত দুষ্টু ব্যক্তি’: ইরানের প্রেসিডেন্টমিয়ানমারের সিত্তুয়েতে রোহিঙ্গাদের জন্য রেডক্রসের ত্রাণবাহী নৌকায় বৌদ্ধদের হামলাজলি আত্মহত্যা প্ররোচণা মামলার চার্জশিট -‘সঠিক জবানবন্দি উপস্থাপন করতে পারেনি পুলিশ’রোহিঙ্গাদের জন্য জরুরী মানবিক সহায়তা ২৬২ কোটি ৩ লাখ টাকা দেবে যুক্তরাষ্ট্র ‌‘রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আপনাদের ঐক্য প্রদর্শন করুন’ : ওআইসিকে প্রধানমন্ত্রীপৌর অবকাঠামো উন্নয়নে ২০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দেবে এডিবিরোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস ট্রাম্পেররোহিঙ্গা ইস্যুতে মুখ খুললেন : আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা আহ্বান সুকি'র রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নির্যাতন বন্ধে এটাই সুচি’র শেষ সুযোগ : জাতিসংঘ মহাসচিব দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডনে পাতাল রেলে বিস্ফোরণ : পুলিশের দাবী সন্ত্রাসী হামলাজাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী আজ নিউইয়র্ক যাচ্ছেনমিয়ানমারের আকাশসীমা লংঘনের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশমানুষকে খাদ্য নিয়ে কষ্ট পেতে দেব না : সংসদকে প্রধানমন্ত্রীরাখাইন রাজ্যের বর্তমান সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর উদ্বেগ প্রকাশমানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া হয়েছে : প্রধানমন্ত্রীএ সমস্যা মিয়ানমার তৈরি করেছে-রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান তাদেরকেই করতে হবে : সংসদকে প্রধানমন্ত্রীমন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতিসংঘ পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তি স্বাক্ষরের অনুমোদনওআইসি সম্মেলনে যোগ দিতে রাষ্ট্রপতি আজ আস্তানার উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করবেননির্বাচনকে প্রভাবিত করার রাজনীতি বিএনপি'র হাত ধরেই শুরু হয়েছে : প্রধানমন্ত্রী
  • বিএনপির সঙ্গে কোন রাজনৈতিক সমঝোতা নাকচ করে দিলেন প্রধানমন্ত্রীট্রাম্প হচ্ছেন ‘আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নবাগত দুষ্টু ব্যক্তি’: ইরানের প্রেসিডেন্টমিয়ানমারের সিত্তুয়েতে রোহিঙ্গাদের জন্য রেডক্রসের ত্রাণবাহী নৌকায় বৌদ্ধদের হামলাজলি আত্মহত্যা প্ররোচণা মামলার চার্জশিট -‘সঠিক জবানবন্দি উপস্থাপন করতে পারেনি পুলিশ’রোহিঙ্গাদের জন্য জরুরী মানবিক সহায়তা ২৬২ কোটি ৩ লাখ টাকা দেবে যুক্তরাষ্ট্র ‌‘রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আপনাদের ঐক্য প্রদর্শন করুন’ : ওআইসিকে প্রধানমন্ত্রীপৌর অবকাঠামো উন্নয়নে ২০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দেবে এডিবিরোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস ট্রাম্পেররোহিঙ্গা ইস্যুতে মুখ খুললেন : আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা আহ্বান সুকি'র রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নির্যাতন বন্ধে এটাই সুচি’র শেষ সুযোগ : জাতিসংঘ মহাসচিব দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডনে পাতাল রেলে বিস্ফোরণ : পুলিশের দাবী সন্ত্রাসী হামলাজাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী আজ নিউইয়র্ক যাচ্ছেনমিয়ানমারের আকাশসীমা লংঘনের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশমানুষকে খাদ্য নিয়ে কষ্ট পেতে দেব না : সংসদকে প্রধানমন্ত্রীরাখাইন রাজ্যের বর্তমান সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর উদ্বেগ প্রকাশমানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া হয়েছে : প্রধানমন্ত্রীএ সমস্যা মিয়ানমার তৈরি করেছে-রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান তাদেরকেই করতে হবে : সংসদকে প্রধানমন্ত্রীমন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতিসংঘ পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তি স্বাক্ষরের অনুমোদনওআইসি সম্মেলনে যোগ দিতে রাষ্ট্রপতি আজ আস্তানার উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করবেননির্বাচনকে প্রভাবিত করার রাজনীতি বিএনপি'র হাত ধরেই শুরু হয়েছে : প্রধানমন্ত্রী
উপরে