প্রকাশ : ০৬ জুলাই, ২০১৬ ০২:১৪:১৯
নড়াইল থেকে হারিয়ে যাচ্ছে প্রাচীণ ঐতিহ্যের নৌকা, কারিগররা ঝুঁকছেন বিকল্প পেশায়
বাংলাদেশ বাণী টোয়েন্টিফোর ডটকম, উজ্জ্বল রায়, নড়াইল জেলা প্রতিনিধি : “তুমি বেশ বদলে গেছো পুরনো সৈকতে আর পানসি ভেড়াও না’ কিংবা ‘মন মাঝি তোর বৈঠা নেরে, আমি আর বাইতে পারলাম না’। এক সময় নৌকায় চড়ে দূরে কোথাও যাতায়াত কিংবা নতুন বৌকে নৌকায় চড়িয়ে বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়িতে আনার সময় মাঝি-মাল্লার এসব ভাটিয়ালী, মুর্শিদী ও মারিফতি গানে মন কেড়ে নিতো।
সে সময় চিত্রা নদী বিধৌত নড়াইল ও পার্শ্ববর্তী উপজেলা গুলোতে চলাচলের অন্যতম ও শৌখিন মাধ্যম ছিলো পালতোলা পানসি, গয়না, ছুঁইওয়ালা (একমালাই) ও রাজাপুরী নৌকা। এছাড়াও নড়াইলের জমিদারদের চলাচলের জন্য ময়ূর পঙ্খী, ধর্ণাঢ্য ব্যক্তিদের জন্য বজরা এবং মালামাল পরিবহনের জন্য সাম্পান, বালার ও বাতনাই নৌকার প্রচলন ছিলো। কালের বিবর্তনে এখন চিত্রা নদীর অধিকাংশ দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় হারিয়ে গেছে  প্রাচীণ ঐতিহ্যের চিরচেনা এসব নৌকা। এখন কালে ভদ্রে কোথাও এসব নৌকার দেখা মেলেনা। তবে এখনও বর্ষা মৌসুমে বিলাঞ্চলবাসীর যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের একমাত্র বাহনই হচ্ছে নৌকা। জেলার হাজার হাজার মানুষের মৎস্য শিকারের কাজেও অন্যতম ভূমিকা রাখে নৌকা। নৌকায় জাল, চাই (মাছ ধরার ফাঁদ) অথবা বড়শি নিয়ে মৎস্য শিকারে ছুটে চলেন জেলেরা। তবে এসব নৌকাকে অঞ্চল ভেদে পেনিস, ডিঙ্গি, কোসা ও মাছ ধরার নৌকা বলা হয়। নৌকা পৃথিবীর অনেক দেশে ক্রীড়া ও প্রমোদের জন্য ব্যবহৃত হলেও নদীমাতৃক বাংলাদেশে নৌকা যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম। এছাড়া পণ্য পরিবহণ ও জেলেদের মাছ ধরার কাজে নৌকার ব্যবহার হয়ে থাকে। বাংলাদেশে বর্ষাকালে নৌকা প্রচুর ব্যবহার হয়। নৌকার চালককে বলা হয় মাঝি। নৌকার বিভিন্ন অংশ হলো-খোল, পাটা, ছই বা ছাউনী, হাল, দাঁড়, পাল, পালের দড়ি, মাস্তল, নোঙর, গলুই, বৈঠা, লগি ও গুণ। নৌকা প্রধানত কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়। মাছ ধরার ডিঙ্গি আকারে ছোট, আবার পণ্য পরিবহণের নৌকা আকারে বেশ বড়। ছই বা ছাউনী তৈরিতে বাঁশ বব্যহার করা হয়। খোলকে জলনিরোধ করার জন্য আলকাতরা ব্যবহার করা হয়। লগি তৈরি হয় বাঁশ থেকে। পাল তৈরি হয় শক্ত কাপড় জোড়া দিয়ে। গঠনশৈলী ও পরিবহণের উপর নির্ভর করে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের নৌকার প্রচলন রয়েছে যেমন-ছিপ, বজরা, ময়ূরপঙ্খী, গয়না, পানসি, কোষা, ডিঙ্গি, পাতাম, বাচারি, রপ্তানি, ঘাসি ও সাম্পান। নববইয়ের দশক থেকে বাংলাদেশে নৌকায় ইঞ্জিন লাগানো শুরু হয়। ফলে নৌকা একটি যান্ত্রিক নৌযানে পরিণত হয়। এ যান্ত্রিক নৌকাগুলি শ্যালো নৌকা নামে পরিচিত। সাম্পান নৌকা বাংলাদেশের বিভিন্ন ধরনের নৌকার মধ্যে সাম্পান সবচেয়ে বেশি পরিচিত। এদেশের লোকগীতি ও সাহিত্যে সাম্পান নৌকার উল্লেখ পাওয়া যায়। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে ভেসে বেড়ায় সাম্পান। এ নৌকা গুলির সামনের দিকটা উঁচু আর বাঁকানো, পেছনটা থাকে সোজা। প্রয়োজনে এর সঙ্গে পাল থাকে আবার কখনও থাকে না। এক মাঝিচালিত এই নৌকাটি মাল পরিবহণের জন্য ব্যবহৃত হয়। গয়না নৌকা গয়না নৌকা আকৃতিতে মাঝারি ধরনের। মূলত যাত্রী পারাপারের কাজেই এ নৌকা ব্যবহার করা হতো। একসাথে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন পর্যন্ত যাত্রী বহন করার ক্ষমতা ছিল এই নৌকাটির। বর্তমানে গয়না নৌকা বিলুপ্তি হয়ে গেছে। বজরা নৌকা আগের দিনের ধনী লোকেরা শখ করে নৌকা ভ্রমণে যেতেন। তাদের কাছে বেশ জনপ্রিয় ছিল বজরা নৌকা। বজরাতে তারা এক রকম ঘরবাড়ি বানিয়ে নিতেন। ফলে এতে খাবার দাবারসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাই থাকতো। কোনটিতে আবার পালও থাকতো। এতে থাকতো চারজন করে মাঝি।  বাইচের নৌকা নৌকা বাংলাদেশে এতোটাই জীবনঘনিষ্ঠ ছিলো যে, এই নৌকাকে ঘিরে হতো অনেক মজার মজার খেলা। তার মধ্যে নৌকাবাইচ এখনও একটি জনপ্রিয় খেলা। বাইচের নৌকা লম্বায় ১৫০ থেকে ২০০ ফুট পর্যন্ত হয়। প্রতিযোগিতার সময় এতে ২৫ থেকে ১০০ জন পর্যন্ত মাঝি থাকতে পারে। আগে নবাব-বাদশাহরা বাইচের আয়োজন করতেন। এইসব বাইচের নৌকার সুন্দর সুন্দর নাম দেওয়া হতো যেমন, পঙ্খীরাজ, দ্বীপরাজ, সোনার তরী প্রভৃতি। এখনও প্রতি বছর বরেণ্য চিত্রশিল্পী এস.এম সুলতান মেলা উপলক্ষে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নৌকা বাইচের আয়োজন করা হয়ে থাকে। ময়ূরপঙ্খী নৌকা  আগেকারদিনের রাজা বাদশাহদের সৌখিন নৌকার নাম হলো ময়ুরপঙ্খী। এর সামনের দিকটা দেখতে ময়ূরের মতো বলে এর নাম দেওয়া হয়েছিলো ময়ূরপঙ্খী। এ নৌকা চালাতে প্রয়োজন হতো চারজন মাঝি ও দুটো করে পাল। ডিঙ্গি নৌকা  সবচেয়ে পরিচিত নৌকার নাম হচ্ছে ডিঙ্গি নৌকা। নদীর তীরে যারা বাস করেন তারা সকলেই এই নৌকাটি ব্যবহার করেন নদী পারাপার বা অন্যান্য কাজে। আকারে ছোট বলে এই নৌকাটি চালাতে একজন মাঝিই যথেষ্ট। মাঝে মাঝে এতে পালও লাগানো হয়। বালার ও বাতনাই নৌকা  প্রাচীনকালে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য ব্যবহৃত বিখ্যাত নৌকার নাম ছিলো বালার ও বাতনাই। এই নৌকাগুলি আকারে অনেক বড় এবং প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ টন পর্যন্ত মালামাল বহন করতে পারতো। বৈঠা বাওয়ার কাজ করতো ১০ থেকে ১৫ জন মাঝি। এ ধরনের নৌকায় পাল থাকতো দুটো করে। কিন্তু এ ধরনের নৌকা এখন আর বাংলাদেশের কোথাও দেখা যায়না। বর্তমানে মাছধরা নৌকাই কেবল সগৌরবে প্রাচীণকালের নৌকার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে, যা হারাবে না কোনোদিন। পেনিস নৌকা  চাম্বল আর রেইনট্রি কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয় ছোট আকারের কমদামি পেনিস নৌকা। বছরে একবার শুধু বর্ষা মৌসুমে ব্যবহারের জন্য এ নৌকা বেশি বিক্রি হয়ে থাকে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই জমে উঠে নৌকার হাট। আর এ মৌসুমে নৌকা তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন জেলার বিশাল জনগোষ্ঠী। জৈষ্ঠ্য থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত নড়াইলে রামসিদ্ধি এলাকায় বিশাল নৌকার হাট বসে। এছাড়াও বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকেই বিভিন্নস্থানে চলে নৌকা বানানোর ধুম। ছুঁইওয়ালা (একমালাই) নৌকা এক সময় নৌকায় চড়ে দূরে কোথাও যাতায়াতের একমাত্র ও অন্যতম মাধ্যম ছিল পালতোলা পানসি ও ছুঁইওয়ালা (একমালাই) নৌকা। কালের বিবর্তনে পানসি নৌকা হারিয়ে গেলেও আজো দেখা মেলে ছুঁইওয়ালা নৌকার। কদিনবদলের সাথে সাথে এখন বদল হয়ে গেছে বিলাঞ্চলের জীবনমানের চিত্র। অধিকাংশ এলাকায় এখন সড়ক পথে যোগাযোগের জন্য উন্নত মানের রাস্তাঘাট নির্মান হয়েছে। যে কারনে ক্রমেই ওইসব এলাকা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে চিরচেনা নৌকা। বর্তমানে নড়াইল ফেরিঘাটে ফেরির বিকল্প হিসাবে কয়েকজন মাঝিকে নৌকা বাইতে দেখা যায়। এছাড়া নৌকার তেমন চাহিদা না থাকায় বর্তমানে নৌকার কারিগররা অন্য পেশা দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। সচেতন মহলের দাবি, সরকার যদি নৌকা শিল্পে পৃষ্ঠপোষকতা করে, তাহলে পুনরায় এ শিল্প গতিশীল হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশ বাণী/কাসা/ডেস্ক/নি.প্রতি/উজ্জ্বল/নড়াইল/০৬/০৭/২০১৬. ০২:১৫ (এএম) ঘ.
সর্বশেষ সংবাদ
  • পৌর অবকাঠামো উন্নয়নে ২০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দেবে এডিবিরোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস ট্রাম্পেররোহিঙ্গা ইস্যুতে মুখ খুললেন : আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা আহ্বান সুকি'র রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নির্যাতন বন্ধে এটাই সুচি’র শেষ সুযোগ : জাতিসংঘ মহাসচিব দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডনে পাতাল রেলে বিস্ফোরণ : পুলিশের দাবী সন্ত্রাসী হামলাজাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী আজ নিউইয়র্ক যাচ্ছেনমিয়ানমারের আকাশসীমা লংঘনের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশমানুষকে খাদ্য নিয়ে কষ্ট পেতে দেব না : সংসদকে প্রধানমন্ত্রীরাখাইন রাজ্যের বর্তমান সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর উদ্বেগ প্রকাশমানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া হয়েছে : প্রধানমন্ত্রীএ সমস্যা মিয়ানমার তৈরি করেছে-রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান তাদেরকেই করতে হবে : সংসদকে প্রধানমন্ত্রীমন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতিসংঘ পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তি স্বাক্ষরের অনুমোদনওআইসি সম্মেলনে যোগ দিতে রাষ্ট্রপতি আজ আস্তানার উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করবেননির্বাচনকে প্রভাবিত করার রাজনীতি বিএনপি'র হাত ধরেই শুরু হয়েছে : প্রধানমন্ত্রীমিয়ানমারের চলমান সহিংসতায় ১ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে : জাতিসংঘরোহিঙ্গা শরণার্থীদের গ্রহণে বাংলাদেশ কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে : ওয়াশিংটনতিনটি ভাষায় প্রকাশিত হচ্ছে শেখ হাসিনার লেখা বই ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’চট্টগ্রাম টেস্টে : ৯ উইকেটে ৩৭৭ রান তুলে দিন শেষে করেছে অসিরাআগাম নির্বাচনের দাবি আগাম রসিকতা ছাড়া আর কিছুই নয় : ওবায়দুল কাদেরঅবিলম্বে সহিংসতা ও রোহিঙ্গা প্রবেশ বন্ধে মিয়ানমারের প্রতি বাংলাদেশের আহ্বান
  • পৌর অবকাঠামো উন্নয়নে ২০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দেবে এডিবিরোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস ট্রাম্পেররোহিঙ্গা ইস্যুতে মুখ খুললেন : আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা আহ্বান সুকি'র রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নির্যাতন বন্ধে এটাই সুচি’র শেষ সুযোগ : জাতিসংঘ মহাসচিব দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডনে পাতাল রেলে বিস্ফোরণ : পুলিশের দাবী সন্ত্রাসী হামলাজাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী আজ নিউইয়র্ক যাচ্ছেনমিয়ানমারের আকাশসীমা লংঘনের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশমানুষকে খাদ্য নিয়ে কষ্ট পেতে দেব না : সংসদকে প্রধানমন্ত্রীরাখাইন রাজ্যের বর্তমান সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর উদ্বেগ প্রকাশমানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া হয়েছে : প্রধানমন্ত্রীএ সমস্যা মিয়ানমার তৈরি করেছে-রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান তাদেরকেই করতে হবে : সংসদকে প্রধানমন্ত্রীমন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতিসংঘ পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তি স্বাক্ষরের অনুমোদনওআইসি সম্মেলনে যোগ দিতে রাষ্ট্রপতি আজ আস্তানার উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করবেননির্বাচনকে প্রভাবিত করার রাজনীতি বিএনপি'র হাত ধরেই শুরু হয়েছে : প্রধানমন্ত্রীমিয়ানমারের চলমান সহিংসতায় ১ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে : জাতিসংঘরোহিঙ্গা শরণার্থীদের গ্রহণে বাংলাদেশ কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে : ওয়াশিংটনতিনটি ভাষায় প্রকাশিত হচ্ছে শেখ হাসিনার লেখা বই ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’চট্টগ্রাম টেস্টে : ৯ উইকেটে ৩৭৭ রান তুলে দিন শেষে করেছে অসিরাআগাম নির্বাচনের দাবি আগাম রসিকতা ছাড়া আর কিছুই নয় : ওবায়দুল কাদেরঅবিলম্বে সহিংসতা ও রোহিঙ্গা প্রবেশ বন্ধে মিয়ানমারের প্রতি বাংলাদেশের আহ্বান
উপরে